কম্পিউটার কেনার আগে যে বিষয়গুলো জেনে রাখা জরুরী
- Jul 10, 2021
- 6 min read
কম্পিউটার কেনার আগে আমরা অনেকেই অনেক সময় দ্বিধায় পড়ে যাই। কম্পিউটারের সিপিইউ কি? কোন পার্টস টা কেনা বেশি জরুরী? মাদারবোর্ড, র্যাম, গ্রাফিকস কার্ড, পাওয়ার সাপ্লাই এগুলোর কাজ কি? কতটুকু র্যাম আপনার কাজের জন্য দরকারী? ইত্যাদি বিষয়ে আমরা অনেকেই জানিনা। চলুন আজ থেকে জেনে নেই।
সিপিইউ বক্স (Cpu box)
একটা সম্পূর্ণ কম্পিউটারের কয়েকটা ভাগ থাকে, যেমন সিপিইউ বক্স, মনিটর, কি-বোর্ড, মাউস ইত্যাদি। তবে অনেক মানুষ কম্পিউটার বলতে শুধু সিপিইউ বক্সকেই বোঝায়। Central Processing Unite সংক্ষেপে CPU, এটি হলো একটি কম্পিউটারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এর কারণ, সিপিইউ হলো কম্পিউটারের মগজ। এর মাধ্যই কম্পিউটার তার যাবতীয় কাজ করে থাকে। একটি কম্পিউটারের সিপিইউ যত ভালো হবে কম্পিউটার তত ভালো ভাবে কাজ করতে পারবে৷ তাই আপনি যখন একটি কম্পিউটার বা পিসি বিল্ড করবেন তখন সিপিইউ(Cpu box) তে বেশি টাকা ঢালার চেষ্টা করবেন।

উপরের কম্পিউটারের ঠিক ডান পাশের লম্বা বক্সটিই সিপিইউ বক্স। এর ভেতর অনেক গুরুত্বপূর্ণ কিছু পার্টস থাকে। প্রতিটা পার্টসেরই আলাদা আলাদা কাজ করতে হয়৷ এই পার্টগুলো কিন্তু আবার অনেক ব্যায়বহুল হয়ে থাকে। নিম্নে সে পার্টস গুলোর পরিচয় দিয়ে দেয়া হলো।
মাদারবোর্ড (Motherboard)
লম্বা বক্সের ঠিক মাঝখানে স্ক্রু দিয়ে লাগানো, হার্ড বোর্ডের মত পাতলা চতুর্ভুজ আকৃতির একটা সিট থাকে, এটাকে বলে মাদারবোর্ড। এই বোর্ডেই সিপিইউর বাকি পার্টস গুলো একে একে ফিট করতে হয়৷ সব পার্ট গুলো লাগানোর জন্য নির্দিষ্ট যায়গা বরাধ্য থাকে। মা যেমন সন্তানকে বুকে ধারণ করে তেমনি এই বোর্ডটি কম্পিউটারের সব পার্টস গুলোকে একসাথে ধারণ করে, তাই এই বোর্ডকে বলা হয় মাদারবোর্ড।
মাদারবোর্ডের আবার নির্দিষ্ট ধারণ ক্ষমতা থাকে, অনেকটা মোবাইলের মেমোরি কার্ড স্লটের মত। যেমন: কিছু ফোনে ৩২ জিবি আবার কিছু ফোনে ১২৮ জিবি বা তার বেশি পর্যন্ত মেমোরি সাপোর্ট করে, তেমনিভাবে মাদারবোর্ডেরও নির্দিষ্ট ধারণ ক্ষমতা আছে। কোনো মাদারবোর্ডে যেমন ৩২ জিবি পর্যন্ত র্যাম সাপোর্ট করে আবার কোনো কোনো মাদারবোর্ড এ ১২৮ জিবি পর্যন্ত র্যাম লাগানো যায়৷ কিছু মাদারবোর্ডে মাত্র ২ টা র্যাম লাগানোর যায়গা থাকে আবার কিছু মাদারবোর্ডে ৪/৮ টা পর্যন্ত র্যাম লাগানোর যায়৷ কোনো কোনো মাদারবোর্ডে ভালো মানের শক্তিশালী প্রসেসর (Processor) লাগানো সম্ভব হয়। সুতরাং মাদারবোর্ড কিনতে হবে আপনার বাজেট অনুযায়ী, বাদ বাকি পার্টসগুলো কিনার পর। আপনার পার্টসগুলো যদি শক্তিশালী হয় তাহলে সেগুলো ধারণ করার জন্যে শক্তিশালী মাদারবোর্ডের প্রয়োজন হবে।

প্রসেসর (Processor/Cpu)
প্রসেসর হলো একটি কম্পিউটারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্টস বা অংশ। এতই গুরুত্বপূর্ণ যে, এরই নামে পুরো সিপিইউ বক্সটার নামকরণ করা হয়। খুবই ছোট চারকোণাকৃতির এই প্রসেসর, মাদারবোর্ডের ঠিক কেন্দ্রে থাকে এবং কম্পিউটারের বাকি পার্টসগুলো কে নিয়ন্ত্রণ করে। এর উপর অনেক সময় একটা কুলিং ফ্যান ঘুরতে থাকে, যার কারণে একে সহজে দেখা যায়না। কম্পিউটারের প্রায় অধিকাংশ পার্টসগুলোই এই প্রসেসরের উপর নির্ভরশীল। আপনার স্মার্টফোনেও কিন্তু একটা প্রসেসর আছে, যেমন ওয়াল্টনের মিডিয়াটেক, হুয়াওয়ের হাইসিলিকন কিরিন, শাওমির স্ন্যাপড্রাগন ইত্যাদি। তবে, কম্পিউটারের প্রসেসর গুলো মোবাইলেরগুলোর তুলনায় অনেক শক্তিশালী হয়ে থাকে।
একটি কম্পিউটারের প্রসেসর তৈরি করা খুবই সময় সাপেক্ষ এবং ব্যায়বহুল ব্যাপার। সারাবিশ্বে মাত্র হাতে গোনা কিছু কোম্পানি প্রসেসর তৈরি করে থাকে। তাই এগুলোর দামও হয় বেশি। বর্তমানে সবচেয়ে জনপ্রিয় দুটি প্রসেসর ব্র্যান্ড হলো, রাইজেন (Ryzen) এবং ইন্টেল (Intel)। রাইজেনের প্রসেসর কে R দিয়ে এবং ইন্টেলের প্রসেসরকে i দিয়ে চিহ্নিত করা হয়। যেমন: Ryzen 7 = r7, Intel 7 = i7 অথবা core i7।
লক্ষ রাখবেন, সব মাদারবোর্ড এ সব রকমের প্রসেসর সাপোর্ট করে না। যেমন, ইন্টেলের প্রসেসর আপনি রাইজেন সাপোর্টেড মাদারবোর্ডে বসাতে পারবেন না। সুতরাং সেদিকে লক্ষ রেখেই আপনার প্রসেসর কিনতে হবে।
প্রসেসর কুলার (Cpu cooler):
একটি প্রসেসর একসাথে অনেকগুলো কাজ করে থাকে, যার ফলে এটি খুব দ্রুত গরম হয়ে যায়। প্রসেসর বেশি গরম হয়ে পরলে তা আপনার কম্পিউটারের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। তাই প্রসেসর সব সময় ঠান্ডা রাখতে হয়। এর জন্য প্রয়োজন পরে প্রসেসর কুলারের।
কুলার দুই ধরণের হয়; এয়ার কুলার এবং ওয়াটার কুলার (AIO)। এয়ার কুলারের সুবিধা হলো এর দাম তুলনামূলক কম কিন্তু শক্তিশালী প্রসেসর হলে অনেক সময় এয়ার কুলারে পর্যাপ্ত ঠান্ডা করা যায় না। আবার এয়ার কুলারে ফ্যান থাকায় কিছু দিন পর ময়লা জমে যায়।
তবে মানের দিক থেকে ওয়াটার কুলার বা লিকুইড কুলার সবচেয়ে ভালো, এতে শীতল লিকুইড পানীয় দ্বারা প্রসেসরকে ঠান্ডা করা হয়। বার বার ফ্যান পরিষ্কার করার ঝামেলা থাকে না। তবে ওয়াটার কুলারের দাম এয়ার কুলারের তুলনায় অনেক বেশি হয়। কিছু কিছু প্রসেসরের সাথে কুলার ফ্রি তেই দিয়ে দেয়। আবার বাজারে আলাদা শক্তিশালী কুলারও কিনতে পাওয়া যায়৷
র্যাম (RAM)
'র্যান্ডম এক্সেস মেমোরি' সংক্ষেপে বলা হয় র্যাম। আমরা যখন মোবাইল বা কম্পিউটারে মাল্টিটাস্কিং বা অনেকগুলো কাজ একসাথে করি যেমন: গান শুনি, গেমস খেলি, কথা বলি, ওয়েব ব্রাউজিং করি তখন কম্পিউটার কিছুটা স্লো হয়ে যায়। এর কারণ র্যাম স্বল্পতা। র্যামের নির্দিষ্ট ধারণ ক্ষমতা রয়েছে। সে ধারণ ক্ষমতা অতিক্রম করলে কম্পিউটার স্লো (Slow) কাজ করা শুরু করে। তখন অতিরিক্ত র্যামের প্রয়োজন পরে। আমাদের র্যাম যত বেশি হবে আমরা তত বেশি কাজ একসাথে করতে পারবো।
বাজারে সাধারণত দুই ধরণের র্যাম পাওয়া যায়। DDR3 এবং DDR4। বর্তমানে DDR4 মডেলের র্যামগুলো সবচেয়ে ভালো। এখন আশা যাক আপনার কত পরিমান র্যামের প্রয়োজন পরবে৷ আপনি যদি কম্পিউটারে সামান্য অফিশিয়াল কাজ, গান শোনা, মুভি দেখা বা নেট ব্রাউজিং করেন তাহলে ৪ অথবা ৮ জিবি র্যাম আপনার জন্য পর্যাপ্ত। অন্যদিকে, আপনি কম্পিউটারে যদি হাইফ্রেম রেট গেমস বা প্রফেশনাল এডিটিং এর কাজ করতে চান তাহলে আপনার আরো বেশি পরিমাণ র্যামের প্রয়োজন পরবে৷
স্টোরেজ (SSD/HDD)
কম্পিউটারে স্টোরেজ হলো অনেকটা মোবাইলের মেমোরি কার্ডের মত। এটি এমন যায়গা, যেখানে আপনি আপনার ছবি, মুভি বা গান ইত্যাদি জমা করে রাখেন।
স্টোরেজ দুই ধরণের৷ একটা হলো হার্ড ডিস্ক ড্রাইভ বা HDD অপরটি সলিড স্টেট ড্রাইভ বা SSD। HDD এর সাথে SSD এর পার্থক্য হলো, HDD বা হার্ড ডিস্কে একটা ছোট ডিস্ক থাকে যা দ্রুত ঘুরতে থাকে। কিন্তু একটা সময় গিয়ে সেটা দুর্বল হয়ে পরে তখন হার্ডডিস্ক আগের মত দ্রুত ফাইল ট্রান্সফার করতে পারে না। অনেক সময় হার্ড ডিস্ক ক্র্যাশ করে যার ফলে নতুন হার্ডডিস্ক কিনে লাগাতে হয়।
অন্যদিকে, SSD হার্ড ডিস্ক থেকে অনেক দ্রুত কাজ করে। এটাতে কোনো ডিস্ক থাকে না, অনেকটা মোবাইলের মেমোরি কার্ডের মত। তাই সহজেই নষ্ট হয়ে পরে না। SSD আবার দুই ধরণের পাওয়া যায়। Sata SSD এবং Nvme SSD। সাটা এর তুলনায় এনভিএমই গুলোর ফাইল ট্রান্সফার রেট অনেক বেশি থাকে।
এখন প্রশ্ন হলো তাহলে মানুষ হার্ডডিস্ক নেয় কেন? শুধু SSD নিলেই তো হয়? এর কারণ SSD এর দাম। ১ টিবি (১০০০ জিবি) HDD হার্ডডিস্ক যেখানে ৩/৪ হাজার টাকা, সেখানে ১ টিবি SSD এর দাম পরবে প্রায় ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা।
গ্রাফিক্স কার্ড (Gpu)
গ্রাফিক্স কার্ড/ এজিপি কার্ড/ জিপিইউ অনেক গুলো নাম এই কার্ডের। সিপিইউ কুলার এর ঠিক নিচে আড়াআড়ি ভাবে মাদারবোর্ডে লাগানো থাকে এই কার্ডটি। গ্রাফিক্স কার্ডের সাহায্যেই মনিটরে স্ক্রিনে ছবি, মুভি বা ভিডিও এগুলো ফুটে ওঠে। আপনার গ্রাফিক্স কার্ড যত ভালো থাকবে আপনি তত বেশি রেজুলুশনের সুন্দর ডিসপ্লে দেখতে পারবেন।
গ্রাফিক্স কার্ড আবার দুই ধরণের হয়। "ইন্টিগ্রেটেড গ্রাফিক্স কার্ড" এবং অপটি "ডেডিকেটেড গ্রাফিক্স কার্ড।"
কিছু কিছু প্রসেসর (Cpu) এর সাথে ফ্রি তে ১ জিবি বা ২ জিবি গ্রাফিক্স কার্ড দেয়া থাকে, এগুলোকে বলে ইন্টিগ্রেটেড গ্রাফিক্স কার্ড। যারা কম্পিউটারে ভারী কোনো গেমস বা এডিটিং এর কাজ না করেন তাদের জন্য এই ইন্টিগ্রেটেড গ্রাফিক্সকার্ড গুলো যথেষ্ট। আলাদা করে গ্রাফিক্স কার্ড কিনার প্রয়োজন নেই। অন্যদিকে ডেডিকেটেড গ্রাফিক্স কার্ড হলো অতিরিক্ত টাকা দিয়ে কেনা গ্রাফিক্স কার্ড। যারা টুকটাক গেমিং এবং ফটো, ভিডিও এডিটিং করে থাকেন তাদের অবশ্যই আলাদা একটি ডেডিকেটেড গ্রাফিক্স কার্ড কিনে নিতে হবে, ইন্টিগ্রেটেড গুলো দিয়ে তখন আর কাজ হবে না।
বর্তমানে গেমিং করার ক্ষেত্রেও ডেডিকেটেড গ্রাফিক্স কার্ড অপরিহার্য। যারা আমার মত কম্পিউটার গেমস খেলতে ভালোবাসেন তাদের কাছে এই গ্রাফিক্স কার্ড হীরার চেয়ে দামী জিনিস। বর্তমান কম্পিউটার গেমসগুলো খুবই হাই গ্রাফিক্স এর হয়ে থাকে সেগুলো খেলতেও অনেক হাই লেভেলের গ্রাফিক্স কার্ড এর প্রয়োজন পরে। গেমিং ছাড়াও বিভিন্ন প্রফেশনার গ্রাফিক্স ডিজইনিং ও এডিটিং এ ভালো মানের গ্রাফিক্স কার্ডের দরকার হয়।
পাওয়ার সাপ্লাই (Power Supply/ PSU)
সিপিইউ বক্সের ঠিক নিচের দিকে আরেকটি চারকোণা বিশিষ্ট বক্স থাকে, এটাকে বলা হয় পাওয়ার সাপ্লাই। পাওয়ার সাপ্লাই এর কাজ হলো কম্পিউটারের সকল পার্টসগুলোতে পর্যাপ্ত পাওয়ার বা বিদ্যুৎ সরবরাহ করা৷
তারের মাধ্যমে যে পরিমান বিদ্যুৎ পাওয়া যায় তা আপনার কম্পিউটারের জন্য পর্যাপ্ত নয়। পার্টসগুলো ঠিক ভাবে পাওয়ার না পেলে বড় রকমের ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। তাই অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করার জন্য পাওয়ার সাপ্লাই এর প্রয়োজন হয়। আপনার কম্পিউটার পার্টসগুলো যতবেশি শক্তিশালী হবে তত বেশি ওয়াটের পাওয়ার সাপ্লাই দরকার পরবে।
ভালো মানের পাওয়ার সাপ্লাই চেনার একটি উপায় হলো সার্টিফিকেট দেখে কিনা। এই পাওয়ার সাপ্লাই গুলোকে আবার পরিক্ষা করে ৩ ধরণের সার্টিফিকেট প্রদান করা হয়। সেগুলো হলো ৮০ প্লাস ব্রোঞ্জ, ৮০ প্লাস সিলভার এবিং ৮০ প্লাস গোল্ড। এর মধ্যে ৮০ প্লাস গোল্ড সার্টিফাইড পাওয়ার সাপ্লাই সবচেয়ে ভালো। তবে এগুলোর দামও তুলনামূলক ভাবে বেশি।
কেইসিং বা চেসিস (Casing)
সিপিইউ বক্সের বাহিরের আবরণ, যা দিয়ে সবকিছু ঢেকে রাখা হয় তাকে বলে কেইসিং। এই কেইসিং এর ভেতর কম্পিউটারের প্রায় সকল পার্টসগুলো বন্দি থাকে।
কেইসিং কেনার সময় এর সৌন্দর্য এবং বায়ু চলাচলের বিষয়টি মাথায় রাখতে হয়। কেইসিং এ বায়ু চলাচল ঠিক থাকলে ভেতরের পার্টসগুলো অনেকদিন ভালো থাকে। বাজারে বিভিন্ন আকার আকৃতির ও ডিজাইনের কেইসিং কিনতে পাওয়া যায়।
—————
লক্ষ করবেন আমি মনিটর, কি বোর্ড, মাউস, ইউপিএস এগুলো বাদ রেখেছি কারণ এগুলো সিপিইউ বক্সের অংশ নয়। তাছাড়া এগুলো সম্পূর্ণ ব্যাক্তিগত পছন্দের জিনিস। তাই এগুলো নিয়ে অন্য আরেকদিন আলোচনা করা যাবে। আজ এ পর্যন্তই, সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ।





















Comments