PEGASUS SPYWARE Explained in Bangla
- Jul 23, 2021
- 3 min read
সম্প্রতি ইন্টারনেশনাল মিডিয়া কনসোর্টিয়ামের এক অনুসন্ধানে উঠে আসে, ইসরাইলের এনএসও গ্রুপ (NSO Group) কর্তৃক নির্মিত একটি স্পাইওয়্যার। যার মাধ্যমে পৃথিবীর প্রায় ৫০ হাজার মানুষের ফোন নাম্বারকে টার্গেট করা হয়েছে। এই তালিকায় নাম রয়েছে আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেরও, যার মধ্যে আছে সরকার ও বিরোধীদলীয় নেতা, সাংবাদিক, এক্টিভিস্ট ও বিজনেস পার্সনদের নাম্বারও।

স্পাইওয়্যার কি?
স্পাইওয়্যার বা স্পাই সফটওয়্যার হলো এমন এক ধরণের সফটওয়্যার, যা আপনার মোবাইল বা কম্পিউটারে প্রবেশ করে আপনার অজান্তেই ব্যাক্তিগত তথ্য উপাত্ত যেমন ম্যাসেজ, কল হিস্টোরি, ইমেইল ইত্যাদি তার মালিকের ডিভাইসে পাঠিয়ে দিতে সক্ষম।
পেগাসাস স্পাইওয়্যার কি?
পেগাসাস হলো ইসরাইলের এনএসও গ্রুপ (NSO Group) দ্বারা নির্মিত একটি শক্তিশালী স্পাইওয়্যার যা মূলত মোবাইল ডিভাইস বা স্মার্টফোনকে টার্গেট করে বানানো হয়েছে৷ এনরয়েড (Android) এবং আইওএস (IOS) উভয় ডিভাইসের উপরই সমানভাবে কাজ করতে পারে এই পেগাসাস।
পেগাসাস এত শক্তিশালী কেনো?
সাধারণ স্পাইওয়্যারগুলো "স্পিয়ার ফিশিং" টেকনিক এর মাধ্যমে কোনো ফোনে প্রবেশ পেতে পারে। স্পিয়ার ফিশিং এমন একটি টেকনিক যেখানে, আপনার ফোনে বা মেইল এড্রেসে একটি অপরিচিত লিংক পাঠানো হয়। লিংক এ প্রবেশ করা মাত্রই আপনার ফোনে সেই স্পাইওয়্যারটি ইন্সটল হয়ে যায়। কিন্তু এই পেগাসাস স্পাইওয়্যার সাধারণ স্পাইওয়্যারগুলো থেকে আরো অনেক বেশি উন্নত।
আমরা যে সফটওয়্যার গুলো নিয়মিত ব্যবহার করে থাকি যেমন ফেসবুক, মেসেঞ্জার, ওয়াটস অ্যাপ ইত্যাদিতে অনেক সময় কিছু ভুল থাকে যা ধীরে ধীরে উঠে আসে। এগুলোকে বলা হয় "সফটওয়্যার বাগ" (bug)। আর এই বাগগুলোকেই ব্যবহার করে থাকে পেগাসাস। যার কারণে কোনো সিকিউরিটি সফটওয়্যার বা এন্টিভাইরাসও এই পেগাসাসকে ধরতে পারেনা।
২০১৯ সালে, শুধুমাত্র একটা ওয়াটস অ্যাপ মিসডকলের মাধ্যমে এই স্পাইওয়্যারটি একটি ফোনে প্রবেশ করে ফেলে এবং পরবর্তীতে সেই মিসডকলটি ডিলিটও করে দিতে সক্ষম হয়। এরূপ পরিস্থিতিতে সেই ইউজার জানতেও পারে না যে তার ফোনে একটি স্পাইওয়্যার ঢুকে পরেছে। এ কারণে পেগাসাসকে বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী স্পাইওয়্যারগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা হয়।
পেগাসাস আপনার কি ক্ষতি করতে পারে?
স্পাইওয়্যারের কাজ হলো অনেকটা গুপ্তচরের মত। অন্যের ফোনে ঢুকে ইনফরমেশন কালেক্ট করা এবং তা তার মালিককে পাঠিয়ে দেয়া। এই পেগাসাস স্পাইওয়্যার একটি ফোনে ঢুকে ব্যবহারকারীর কল লগ, কল হিস্টোরি, এসএমএস, ব্রাওজার হিস্টোরি, লোকেশন ইত্যাদির পাশাপাশি ফোনের ক্যামেরা ও মাইক্রোফোন পর্যন্ত ব্যাবহার করে ব্যবহারকারীর অজান্তেই তার কথা বা ছবি ধারণ করতে পারে।
কারা এই পেগাসাস ব্যবহার করে থাকে?
পেগাসাস নামের এই স্পাইওয়্যারটি সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্য নয়। এনএসও গ্রুপের দাবী, এই স্পাইওয়্যার মূলত তৈরি করাই হয়েছে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও সেনাবাহিনীর ব্যবহারের জন্য। পেগাসাস খুব সহজেই আন্তর্জাতিক অপরাধী ও টেরোরিস্টদের ফোন ট্রেক করে তাদের লোকেশন খুজে বের করে ফেলতে সক্ষম। তাই এর দামও চাওয়া হয় আকাশ ছোঁয়া।
ইকোনোমিক টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক রিপোর্টে এই স্পাইওয়্যার এর দাম সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়; ২০১৬ সালের এক রিপোর্ট অনুযায়ী, এনএসও গ্রুপ মাত্র ১০ টি ডিভাইসে তাদের এই স্পাইওয়্যার প্রতিস্থাপনের জন্য দাম চেয়েছিল ৬,৫০,০০০ মার্কিন ডলার৷ পেগাসাসের একটি মাত্র লাইসেন্স, যা দিয়ে হাতে গোনা কিছু ডিভাইসকে ট্র্যাক করা সম্ভব, এর দামও ছিল ৭০ লাখ রুপি।
তবে অপরাধী ব্যাতিত অন্য কারো উপর নজরদারি করার ক্ষেত্রে এ স্পাইওয়্যার ব্যবহার করা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ বলে দাবী করছে এনএসও গ্রুপ।
কারা এর আক্রমণের শিকার?
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা "এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল" এই পেগাসাস স্পাইওয়্যার এর উপর একটি দীর্ঘ অনুসন্ধান পরিচালনা করে। অনুসন্ধানটির নাম "ফরেন্সিক মেথডলজি রিপোর্ট"। এই অনুসন্ধানে উঠে আসলে অবাক করা সব তথ্য। এই স্পাইওয়্যার শুধু অপরাধীদের উপর নজরদারিতেই সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন দেশের প্রভাবশালী ব্যাক্তিত্ব, সাংবাদিক, এমনকি মানবাধিকার কর্মীরাও হয়েছে পেগাসাস এর আক্রমণের শিকার।
সম্প্রতি বিবিসির এক রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, বিশ্বের প্রায় ৫০ টি দেশে হাজারেরও অধিক মানুষ এই পেগাসাস দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে বলে একটি তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ভারত, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, হাঙ্গেরি, মেক্সিকো ও মরক্কোর মত দেশগুলো।
শুধুমাত্র ভারতেই, প্রায় ৪০ জন সাংবাদিক, তিনজন বিরোধীদলীয় নেতা ও দুজন মন্ত্রীর উপর পেগাসাসের মাধ্যমে নজরদারির অভিযোগ আনা হয়েছে। এই তালিকায় ভারতের বিরোধী দলীয় নেতা রাহুল গান্ধীর নামও উল্লেখ রয়েছে।
রিপোর্টে আরো উঠে আসে, ২০১৮ সালে নিহত সৌদি সাংবাদিক জামাল খাসোগির কথা। যিনি ইস্তাম্বুলে কর্মরত অবস্থায় আততায়ীর হাতে নিহত হন। তার হবু স্ত্রীর ফোন নাম্বার পেগাসাস এর লিস্টে অন্তর্ভুক্ত ছিল।
২০১৭ সালে নিহত হন মেক্সিকান সাংবাদিক সিসিলিও পিনেদা বারতো। তার ফোন নাম্বারও পেগাসাসের তালিকায় ছিল বলে রিপোর্টটিতে উল্লেখ করা হয়।
এতকিছুর পরও এনএসও গ্রুপ দাবী করছে, তাদের এই পেগাসাস স্পাইওয়্যারটি কোনোভাবেই কোনো হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত নয়। এই স্পাইওয়্যার শুধু অপরাধী ও টেরোরিস্টদের উপরই প্রয়োগ করা হয়। তারা এমন কাউকে তাদের স্পাইওয়্যার সেবা প্রদান করে না যারা সাধারণ মানুষের অধিকার লঙ্ঘন করতে পারে। এক্ষেত্রে তারা এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের এই দীর্ঘ অনুসন্ধানকে সম্পূর্ণ ভ্রান্ত বলে আখ্যায়িত করেছে। পাশাপাশি তাদের উপর আনিত অভিযোগগুলো পুনরায় ক্ষতিয়ে দেখবে বলে আশ্বাস দিয়েছে ইসরাইল ভিত্তিক এই প্রতিষ্ঠানটি।
(Source: BBC, TheEconomicTimes, AmnestyInternational)
Tags:





Comments